গুজবে কমছে আমানত ও রে‌মিটেন্স

অর্থনীতি বাংলাদেশ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলমগীর হোসেন অনেক বছর ধরে থাকেন দুবাইয়ে। প্রতি মাসেই দেশে স্বজনদের কাছে অর্থ (রেমিটেন্স) পাঠান। দেশের ব্যাংকেও জমা রাখেন। কিন্তু গত কয়েক মাস তিনি অর্থ পাঠাচ্ছেন না। তার ভাষ্য, ব্যাংকের আমানতের বিষয় নিয়ে তিনি বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। টাকা উঠানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন।

দুবাই থেকে ফোনে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ফেসবুকসহ নানা মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের কথা শুনে আসলে বুঝতে পারছি না, টাকা পাঠালে পরিবারের লোকজন তা ব্যাংক থেকে ওঠাতে পারবে কি না।’ তিনি জানতে চান, ‘আসলেই দেশের ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি কী? জমানো টাকা তিনি তুলতে পারবেন তো?’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ ডু সামথিং এক্সেপশনাল (ডিএসই)। মাহমুদ সুমন নামে একজন সেখানে লিখেছেন, ‘সামনের ডিসেম্বরের পর থেকে আশা করা যাচ্ছে ডলারের রেট আরও বেড়ে যাবে। বিষয় হলো আমি কি জমানো টাকা ডলারে কনভার্ট করে নিজের কাছে রাখতে পারব? এ রকম কোনো পদ্ধতি আছে কি? জানা খুব প্রয়োজন।’

উত্তরে জামিল আহমেদ আহাদ নামে একজন লিখেছেন, ‘টাকাগুলোকে শীঘ্রই স্বর্ণে পরিণত করুন। কারণ দিন দিন টাকার ভ্যালু কমতেছে। কেয়ামতের আলামত সম্পর্কে জানুন, এজন্য আবু ত্বহা আদনানের লেকচার দেখতে পারেন।’ সিয়াম মাহমুদ তন্ময় নামে আরেকজন পরামর্শ দিচ্ছেন, ‘টাকা তুলে জমি কেনেন আর গোল্ড কেনেন।’ হান ইয়েং নামে আরেক পরামর্শক বলছেন, ‘গতকাল একটা পোস্টের কমেন্টে এই কথা বলে গারদদের রোষানলে পড়েছিলাম। অর্থনীতিবিদরা আরও বছর তিনেক আগ থেকেই সাবধান করেছেন বাংলাদেশি ব্যাংকে টাকা না রাখার জন্য। আপনার টাকা রাঘববোয়ালদের পেটে ঢুকে যাবে ভাই, আপনি এর কোনো বিচার পাবেন না। আপনার উচিত এই টাকা এক মাসের মধ্যেই সবগুলো কোনো কারণ দেখিয়ে তুলে ফেলেন। না হলে এগুলো হারাবেন।’

এই পোস্টে এমন প্রায় ৯০০ জনের মন্তব্য, যাদের অধিকাংশই জানতে চাচ্ছেন কোন ব্যাংকের কী অবস্থা। বেশিরভাগ পোস্ট দেখেই বোঝা যাচ্ছে তারা আতঙ্কিত। এমন আরও অসংখ্য পোস্ট চোখে পড়ছে ফেসবুকে। এতে অনেক প্রবাসীর পাশাপাশি সন্দেহ ঢুকে গেছে দেশের আমানতকারীদের মনেও।

শুধু ফেসবুক নয়, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশের ব্যাংকারদের ফোন করে জিজ্ঞেস করছেন দেশে টাকা পাঠাবেন কি না। আবার দেশে থাকেন এমন অনেকেও জানতে চাচ্ছেন, ব্যাংকে এখন টাকা রাখা কতটা নিরাপদ। ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে না তো! ব্যাংকে সঞ্চয় করা কষ্টের টাকা প্রয়োজনের সময় ফেরত পাব তো?

এদিকে গত কয়েক মাসে দেশে রেমিটেন্স আসা কমেছে। সর্বশেষ অক্টোবর মাসে রেমিটেন্স এসেছে ১.৫২৫ বিলিয়ন ডলার। আগের মাসেই তা ছিল ১.৫৩৯ বিলিয়ন ডলার। আগস্টে ছিল ২.০৩৬ বিলিয়ন ডলার।

তবে ব্যাংকসহ আর্থিক খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমানত নিয়ে যা ছড়িয়েছে তা একেবারেই গুজব। দেশের আর্থিক পরিস্থিতি সেরকম খারাপ নয়। দেশের বাজারে ডলারের সংকট থাকলেও আমানত ফেরত দিতে না পারার তথ্য পুরোপুরি মিথ্যা বলে দাবি করেছেন ব্যাংকাররা।

এমনটা যখন আলোচনা হচ্ছে ঠিক সেদিনের পরিসংখ্যান হচ্ছে, ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ এক লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো প্রতিমাসে যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ তার সব টাকাই বিতরণ হয় না। যে টাকা বিনিয়োগ হয় না, তাকেই অতিরিক্ত তারল্য বলা হয়।

শুধু তাই নয়, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ৫৪৭ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫৩ হাজার ৫৯ কোটি টাকা। এর ফলে বাজার থেকে ৫৩ হাজার ৫৯ কোটি টাকা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক কাজের মধ্যে একটা। যখন প্রয়োজন হয় ডলার বিক্রি করে। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার থেকে কিনে নেয় এই মার্কিন মুদ্রা।

এ ছাড়া বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে ব্যাংক খাতের। নতুন অর্থবছরের সব মাসেই ১৩ শতাংশের ওপরেই ছিল প্রবৃদ্ধি। তথ্যমতে, সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল আগের বছরের একই সমেয়ের তুলনায় ১৩.৯৩ শতাংশ বেশি। এর আগের মাস আগস্টে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪.০৭%।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জিএম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমরাও শুনেছি বাজারে একটি গুজব রটিয়েছে দুষ্টচক্র। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন সুদৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারবে না এমন কোনো ব্যাংক নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো চক্র এমন গুজব রটাতে পারে।’

এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী সেলিম আর এফ হোসেইন বলেন, ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমন একটা ব্যাংকও পাওয়া যাবে না যারা আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিচ্ছে না।

ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকের আমানতে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমদানি দায় মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করছে। এর ফলে বাজার থেকে টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে চলে যাচ্ছে কথাটা সত্য। কিন্তু এর প্রভাবে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে এমন তথ্য মোটেও সত্য নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও ডলারের দাম বাড়ার কারণে এখন মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এই মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে টাকার সাপ্লাই কমাতে হবে। মানুষের হাতের টাকার সাপ্লাই বাড়তে থাকলে তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। এখন বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে তবে এটা যদি উৎপাদন খাতে ব্যয় হয় তাহলে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়বে না, তাই ব্যাংকগুলোকে উৎপাদন খাতেই ঋণ দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *