সিঙ্গাপুর বন্দর দিয়ে দেশে উৎপাদিত হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের পরিবহন সীমিত

প্রধান সংবাদ বাংলাদেশ

বাংলাদেশের পণ্যের প্রায় অর্ধেকই রপ্তানি হয় সিঙ্গাপুর বন্দর ব্যবহার করে। চট্টগ্রাম থেকে ছোট জাহাজে করে পণ্যভর্তি কন্টেইনার নিয়ে রাখা হয় সিঙ্গাপুর বন্দরে। সেখান থেকে সেগুলো তুলে দেয়া হয় বড় জাহাজে। আর সেই সিঙ্গাপুর বন্দর দিয়ে বাংলাদেশের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের চালান পরিবহন সীমিত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে পাঠানো এক নোটিশে ওই বন্দর কর্তৃপক্ষ একথা জানিয়ে দেন। ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড নিয়ে বিধিনিষেধ’ শীর্ষক সিঙ্গাপুর বন্দরের ওই নোটিশে বলা হয়, ৪ঠা জুন রাতে বাংলাদেশে কন্টেইনার ডিপোতে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর সিঙ্গাপুর বন্দরে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কন্টেইনার খালাস হয়।

নোটিশে জানানো হয়, সিঙ্গাপুর বন্দরে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কন্টেইনারের কতগুলো মজুত করা যাবে, সেটির সীমা রয়েছে। বর্তমানে এখানে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের চালানের মজুত বেড়ে গেছে। নিরাপদ সীমার মধ্যে রাখতে নতুন করে এর চালান গ্রহণ না করতে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।’
সূত্র মতে সীতাকুণ্ডের বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোতে কন্টেইনার বিষ্ফোরণে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ে দেশের উৎপাদিত নতুন এই রপ্তানি পণ্যের বাজার হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। আর এই ঘোষণার মধ্যদিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্য হয়েছে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচ্যুয়াল শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ পারভেজ জানান, বিভিন্ন এজেন্টের কাছে শিপ ওনাররা বার্তা পাঠাচ্ছেন জাহাজে বাংলাদেশ থেকে কন্টেইনার বুকিং এর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে। গতকাল থেকে অধিকাংশ এজেন্ট রপ্তানির জন্য ‘হাইড্রোজেন পার অক্সাইড’ ভর্তি কন্টেইনার বুকিং নেয়া বন্ধ রেখেছে। এর প্রভাব পড়বে রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণে। আইএমডিজি ‘কোড না মানার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠিত হলে নতুন নতুন বিপত্তি যোগ হবে দেশের রপ্তানি পণ্য পরিবহনে।’
জানা গেছে, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড দেশের টেক্সটাইল শিল্পে ব্যবহার করা হয়। এ পণ্য এক সময় বিদেশ থেকে আমদানি করা হলেও বর্তমানে এটি রপ্তানি হচ্ছে। ৪ঠা জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে আগুন, প্রবল শক্তিমাত্রার বিষ্ফোরণে রূপ নেবার কারণ হিসেবে এই কেমিক্যালটিকে দায়ী করা হচ্ছে।
‘হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ‘ রপ্তানির বৈশ্বিক অবস্থানে সতেরতম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এই পণ্যের রপ্তানিতে দশ শতাংশ ভর্তুকি দেশ সরকার। দেশের ৬টি প্রতিষ্ঠান নিজেদের উৎপাদিত হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে। দেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্পের প্রয়োজনীয় ঐ২ঙ২ মোট চাহিদার বড় অংশই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যোগান দেয়। বিষ্ফোরণের নেতিবাচক প্রভাবে এখন পুরোটাই দখলে যাবে বিদেশি উৎপাদনকারীদের হাতে।

পাকিস্তান, নেপালসহ বেশকিছু বাজারে বাংলাদেশ থেকে ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কেনে এমন ক্রেতা রয়েছে। বিষ্ফোরণের সঠিক কারণ চিহ্নিত না হলে কেউই আমাদের দেশের উৎপাদিত কেমিক্যালটি ক্রয় করবে না। এমন কেমিক্যালের কন্টেইনার থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের মতো বড় ধরনের দুর্ঘটনা বিশ্বে প্রথম, ক্রেতাদের মাঝে তৈরি হওয়া আস্থা সংকট কাটতেও বেশ সময় লাগবে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি করে আয় হয়েছে ২ কোটি ৩৩ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০৭ কোটি টাকার সমান। এই খাতের রপ্তানি আয় দ্রুত বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে যে পরিমাণ রপ্তানি হয়েছে, তা আগের অর্থবছরের পুরো সময়ের চেয়ে ২৩ শতাংশ বেশি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের পুরো সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে H2O2 রপ্তানি আয় বেড়েছে তিন গুণ।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বাজারের পুরোটাই আমরা হারাবো। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে এই কেমিক্যাল রপ্তানির প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক ছিল। করোনাকালে সেনিটাইজারসহ বিভিন্নভাবে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের ব্যবহার বাড়ার কারণে যে বৈশ্বিক চাহিদার যোগান দেবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের পরে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড নিয়ে অতিরিক্ত প্রচারণার কারণে তার পুরোটাই ভেস্তে যাবার আশঙ্কা করছেন এই খাতের বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে, ডিপোতে থাকা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের গুণগত মান নিয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদের দ্বিমত পোষণ করে বিবৃতি দিয়েছে আল রাজী কেমিক্যাল কর্তৃপক্ষ। বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা বিগত এক বছর ধরে দেশের (ডীম এক্সপোর্ট) চাহিদার যোগান দেয়ার পর বিদেশে সুনামের সঙ্গে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি করে আসছি। যা বাংলাদেশের অন্য যেকোনো কোম্পানির হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের চেয়ে মানে সেরা ও দক্ষ জনবল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের জেরিক্যানের গুণগত মান সম্পর্কে তথ্য দিতে গিয়ে আল রাজী কেমিক্যাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বাংলাদেশের সকল পার-অক্সাইড কোম্পানির রপ্তানিকৃত জারের ওজন ১.৮৫-১.৯০ কেজি হলেও সেখানে আল রাজী কেমিক্যালের জারের ওজন ১.৯-১.৯৪ কেজি, যা হাই ডেনসিটি পলি ইথিলিন (HDPE) দ্বারা তৈরিকৃত এবং সৌদি আরব থেকে আমদানি করা।

আল রাজী কেমিক্যালের দাবি, জার প্যাকেজিং এর ক্যাপ তৈরি করা হয় ঐউচঊ দিয়ে, যাতে গোর প্যাকিং ভ্যান্ট-উ-১৭ ব্যবহার করা হয়। এটি জার্মানি থেকে আমদানি করা হয়। জার প্যাকেজিং (UN)-২০১৪, ক্লাস ৫.১(৮), প্যাকিং গ্রুপ (||) অনুসারে তৈরিকৃত।
এদিকে, শুধু রপ্তানি পণ্য পরিবহনে বিপত্তি সৃষ্টি হয়েছে তা নয়। কয়েকটি টেক্সটাইল শিল্প মালিকরা তাদের উৎপাদনের ক্ষেত্রে ফাক্টরিতে দেশি হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ব্যবহার সম্পর্কে ক্রেতাদের কাছ থেকে সতর্ক বার্তা পেয়েছেন বলে জানা গেছে। আমদানি করা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ব্যবহারের নির্দেশনা পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন টেক্সটাইল মালিকদের কয়েকজন।
এদিকে, পোশাক শিল্পে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে এমন শংকায় স্মাট গ্রুপের ওয়েব সাইট থেকে বিএম কন্টেইনার ডিপোর নাম সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হাইড্রোজেন পার- অক্সাইড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আল রাজী কেমিক্যালও স্মাট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কন্টেইনারবাহী রপ্তানি পণ্য পরিবহনে নতুন বিপত্তি আসতে পারে অন্যান্য বন্দর থেকেও। বিপদের আশঙ্কায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিপিং লাইন্সের পাশাপাশি বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোগুলো নতুন করে ‘হাইড্রোজেন পার অক্সাইড’ ভর্তি কন্টেইনার নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
এদিকে জাহাজে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ভর্তি কন্টেইনার না নেবার কারণে বিপত্তিতে পড়েছে বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোগুলো। বর্তমানে ডিপোতে রপ্তানির অপেক্ষায় থাকা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কন্টেইনারগুলো সরানোও সম্ভব হচ্ছে না। আবার শিপেও দেয়া যাচ্ছে না। বন্ডের কারণে এসব কন্টেইনার নিরাপদ জায়গায় সরানো নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

এএমজেড টেক্সটাইল লিমিটেডের চেয়ারম্যান সরওয়ার আলমগীর জানান, ‘উৎপাদনের ক্ষেত্রে যেহেতু বায়ারদের নির্দেশনা মেনে চলতে হয় সে কারণে গুণগতমান কিংবা দামের চেয়ে তাদের পছন্দই গুরুত্ব পায় বেশি। বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বায়াররা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *