বাংলাদেশে কাগজের জন্য হাহাকার- সংকটে মুদ্রণ শিল্প, সংবাদপত্র

প্রধান সংবাদ বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সংকটও চরমে। চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলতে পারছে না ব্যাংকগুলো। বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে পেপার মিল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় বছরের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে কাগজের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। চাহিদামতো কাগজ না পাওয়ায় সংকটে পড়েছে মুদ্রণ শিল্প ও সংবাদপত্র। বছরের শেষের দিকে পাঠ্যপুস্তক ছাপার কাজে কাগজের চাহিদা বেড়ে যায়। এই সময়ে এবার সংকট তৈরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ওদিকে গত এক মাসে কাগজের দামও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সংবাদপত্র শিল্পের প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে দেখা দিয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ। করোনার পর ফের হোঁচট খাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে কাগজ ব্যবসায়ীদের। আসন্ন বইমেলায় নতুন বই প্রকাশ করা নিয়েও দুশ্চিন্তায় লেখক ও প্রকাশকরা।

মুদ্রণ শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল কাগজ। কাঁচামাল না হলে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান চালানোর কোনো সুযোগ নেই। কাগজ পাওয়ার পর কালি, প্লেট, গ্লু এসবও আমদানি করতে হয়। তবে ডলার সংকটে এসব কাঁচামাল আমদানিও করা যাচ্ছে না। এতে এই শিল্পে বড় ধাক্কা লাগার উপক্রম তৈরি হয়েছে। শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কাও করেছেন তারা। তাদের মতে, এখন অনেক প্রতিষ্ঠান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। আগে যেখানে ১৮ ঘণ্টা চলতো এখন সেটা ৬-৭ ঘণ্টা চালাতে হচ্ছে। করোনার মধ্যে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এখন সেই পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। লেখা ও ছাপার কাগজে শুল্কহার না কমালে এই সমস্যা দীর্ঘায়িত হবে।

বাবুবাজারের পাইকারি কাগজ ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে এখন সব ধরনের কাগজের চরম সংকট তৈরি হয়েছে। ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে খরচ বেড়েছে। ব্যাংকগুলো থেকে চাহিদামাফিক এলসিও খোলা যাচ্ছে না। এতে প্রধান কাঁচামাল কাগজ তৈরির মণ্ড বা ভার্জিন পাল্প আমদানি করা যাচ্ছে না। ফলে কাগজ সংকটের পাশাপাশি দামও বেড়েছে।

বাবুবাজারের কাগজ ব্যবসায়ী এস আর ট্রেডার্সের মালিক শফিকুর রহমান বলেন, এক মাস আগেও ২৮/৪৪ সাইজের ১০০ সিটের কাগজ ২২০০ টাকা বিক্রি হয়। এখন তা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩০০০ টাকায়। আর ২৩/৩৬ সাইজের ৫০০ সিটের খবরের কাগজের দাম ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ১১০০ টাকার উপরে। বাজারে এখন অনেক চাহিদা। কিন্তু মাল না থাকায় দামও অনেক বেড়েছে। আমরাও ব্যবসা করতে পারছি না।
ব্যাংক এলসি না খোলায় বর্তমানে কাগজের কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য মিলে প্রোডাকশন করা যাচ্ছে না বলে জানান পূর্বাচল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, বই ছাপার জন্য রাইটিং ও প্রিন্টিংয়ের কাগজ প্রতি টন ১ লাখ টাকা ছিল। কিন্তু এখন তা ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা হয়েছে। পাল্প না পাওয়ার কারণে দাম বেড়েছে। এই সংকট চলতে থাকলে আমাদের ব্যবসা করা কঠিন হয়ে যাবে। প্রকাশনা শিল্পও থাকবে না। যারা কাগজ শিল্পের সঙ্গে জড়িত তারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ পেপার মার্চেন্টস এসোসিয়েশনের মনিরুল ইসলাম মামুন বলেন, পত্রিকার কাগজ এক মাস আগেও প্রতি টন ছিল ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু এখন তা ৯০ হাজার টাকায় ঠেকেছে। অগ্রিম টাকা দিয়েও এখন কাগজ পাচ্ছি না। আর্ট পেপার ১৯০০ টাকা ছিল এখন ২৬০০ টাকা হয়েছে।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির চেয়ারম্যান শহিদ সেরনিয়াবাত বলেন, কাগজ না থাকলে ছাপাবো কী। কাগজ আমাদের প্রধান কাঁচামাল। এটা না হলে শিল্পের চাকা ঘুরবে না। আমরা সর্বশেষ যখন টেন্ডার করি তখন বই ছাপার কাগজের টন ছিল ৮০ হাজার টাকার কম। এখন সেই কাগজ ১ লাখ ১৫ হাজার টাকার বেশি। আমদানি করা কাগজগুলোর দামও এখন বেড়েছে।

যে কাগজগুলো একটু উন্নত সেগুলো আমরা বিদেশ থেকে আমদানি করি। কিন্তু সেসব কাগজের দাম অনেক বাড়ছে। ডলারের দাম বাড়ছে এবং কাঁচামাল আমদানি করাই যাচ্ছে না। ফলে এগুলো এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের শিল্পের কাঁচামালগুলো আমদানিনির্ভর। এগুলো আমরা এখন পাচ্ছিই না। প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি শিক্ষার্থীর জন্য ৩৩ কোটি বই ছাপা হবে। এটা আমাদের সবচেয়ে বড় কাগজের কাজ। কিন্তু এই কাজের জন্য আমাদের তিন ভাগের এক ভাগ কাগজের বেশি নাই। তাই তাদের শতভাগ বই পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাদের ১লা জানুয়ারি বই দিতে না পারলে উৎসব করতে পারবে না।

পল্টন এলাকার বিসমিল্লাহ পেপার অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের উপদেষ্টা মো. ইয়াসিন আলী বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রিন্টিং খাতের পিক সিজন। অথচ এই মুহূর্তে সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এক নাম্বার হলো- কোনো ব্যাংক ঋণপত্র (এলসি) খুলছে না। ফলে কোনো কাঁচামাল আমদানি করা যাচ্ছে না। আবার যেসব কাঁচামাল স্বাভাবিক সরবরাহ ছিল সেগুলোর দামও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আগামী জানুয়ারিতে বই উৎসব উদ্‌যাপন করা যাবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

মুদ্রণ শিল্পের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছে সংবাদপত্র শিল্পও। নিউজপ্রিন্ট কাগজের দাম বৃদ্ধির কারণে খরচ বেড়েছে অনেক। গত কয়েক মাস ধরেই প্রতিনিয়ত দাম বাড়ছে। ফলে সংবাদপত্র শিল্পের প্রকাশনা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। পুরাতন ওয়েস্টেজের দামও অনেক বেড়েছে বলে জানান সংবাদপত্র প্রকাশনার সঙ্গে জড়িতরা।

দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মিজানুর রহমান বলেন, খবরের কাগজের দাম অনেক গুণ বেড়ে গেছে। যে কাগজ আমরা আগে ৩০-৩৫ টাকায় কিনেছি। এখন সেটা সর্বনিম্ন ৯০ টাকা। এখন ব্যাংকগুলো এলসিই খুলছে না। সংকট তৈরি হয়েছে। আবার অনেকেই সংকটের সুযোগও নিচ্ছে। আগের এলসির পণ্যও বেশি দামে বিক্রি করছে। কাগজের দাম বাড়ার কারণে আমাদের চ্যালেঞ্জ বেড়ে গেছে। কিন্তু আমাদের বিজ্ঞাপনের রেট বাড়েনি। খরচ বাড়ছে। কাগজ, কালি, প্লেটের দামও বেড়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে যেসব কালি ৩৫০ টাকা কেজি কিনেছি এখন তা ৪১০ টাকা হয়েছে। এখন খুবই কঠিন পরিস্থিতি যাচ্ছে।

সংবাদপত্র প্রকাশনা শিল্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সব ধরনের কাগজের দাম কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সংস্থাটির কার্যালয়ে গত জুনে চলতি অর্থবছরের ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় জানানো হয়, সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এ শিল্পের টিকে থাকা কঠিন। নোয়াব সংবাদপত্র শিল্পের জন্য নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর ভ্যাটমুক্ত সুবিধা দেয়া অথবা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণের দাবি করেছে।

বাংলাদেশ পেপার ইমপোর্টার এসোসিয়েশনের সভাপতি ও এফবিসিসিআই পরিচালক শাফিকুল ইসলাম ভরসা সম্প্রতি বলেন, এখন যে সংকট সেটা ব্যাংক থেকে এলসি না পাওয়ার কারণে। যাদের ‘ডিউটি ফ্রি’ অনুমোদন আছে তারাও খুব বেশি এলসি করতে পারছে না। এখন যে সংকট তা অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে চলে গেছে। এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে যদি এলসি খুলতে না পারি। এলসি খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। এই সংকট ডলার সংকটের কারণে। দেশি কাগজের মিলের এক টন কাগজের (প্রিন্টিং পেপার) রেট ১ লাখ ২০ হাজার থেকে বেড়ে এখন ১ লাখ ৪০ হাজার বা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা হয়ে গেছে। আর লেখার ও বই ছাপার কাগজের রেট বেড়ে এখন প্রতি টন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, সরকার যখন প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত কাগজ বিনামূল্যে দিচ্ছে, সেখানে লেখা বা ছাপার কাগজের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ৬০ শতাংশের বেশি। লেখার বা ছাপা কাগজে ৬০ শতাংশ ট্যাক্স পৃথিবীর কোথাও নেই। শুল্কহার যৌক্তিক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। পাঁচ শতাংশ শুল্ক দিয়ে লেখা ও বই ছাপার কাগজ আমদানি করতে দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *